ভার্সাই চুক্তি কি প্রকৃতই কঠোর ছিল?
অধ্যাপক উইলিয়াম আর বেলনের (Keylor) মতে ভারসাই সম্মেলনের মূল লক্ষ ছিল দুটি । পৃথিবীর প্রায় অর্ধাংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠন এবং শান্তিপ্রতিষ্ঠা।
ভাসাই চুক্তিতে প্রায় ৪৪০টি ধারা ও অজস্র সংযোজন যুক্ত হয়েছিল। জার্মান রাজনীতিবিদরা সহজে এই চুক্তি মেনে নেননি। চ্যাপেলার ফিলিপ শাইডেমান ( Scheidemann) এই অপমানজনক চুক্তিতে স্বাক্ষ দান করার চেয়ে পদত্যাগ করাই শ্রেয়তর মনে করেন। ক্যাথলিক দলের নেতা এবংসবার্গার বুঝতে পেরেছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরে অসম্মতি জানালে জার্মানির স্বাধীনতা বিপন্ন হবে, তাই তিনি ভার্সাই চুক্তি অনুমোদন করাই যুক্তিযুক্ত বোধ করেন।
(ক) আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রিক পুনর্বিন্যাস : পশ্চিম সীমান্তে জার্মানি ফ্রান্সকে আলসাস ও লোরেন ফিরিয়ে
দিল, বেলজিয়ামকে দুটি ছোট অঞ্চল ইউপেন (Eupen মানেড (Malmedy) ছেড়ে দিল এবং
লাক্সেমবার্গের সঙ্গে গঠিত পূর্বতন শুদ্ধ সাথ থেকে বেরিয়ে এল। সারের (Saar) কয়লাখনি অঞ্চল পনেরো
বছরের জন্য জাতিসংঘের কমিশনের অধীনে রাখা হল। ভবিষ্যতে গণভোটের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের নির্ধারণ করা স্থির হয়। যুদ্ধের সময় ফ্রান্সের ক্যালান বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে সার অঞ্চলের মালিকানা ফ্রান্সের হাতে হস্তান্তরিত হল। নবজাত চেকোশ্লোভাকিয়া হালস্ চিন (Hultschim District) জেলা লাভ করল। সুদেতেনল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়ার বাসিন্দারা অনেকে জাতিগত ও ভাষাগত দিক থেকে জার্মান পূর্বতন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের নাগরিক হিসেবে তারা রাজনৈতিকভাবে জার্মান ছিল না। তবু অস্ট্রিয়ার লা যুক্ত হতে আগ্রহী ছিল। মুদেতেনল্যান্ড ছিল ঐতিহাসিক বোহেমিয়া রাষ্ট্রের অংশ। চুক্তিতে ঐ অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক জার্মান জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি সংক্রান্ত সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হলেও ফ্রান্স এ ব্যাপারে আপত্তি করে। জার্মানি ও অস্ট্রিয়া তাদের সংবিধান থেকে সংযুক্তি সংক্রান্ত ধারা বাদ দিতে বাধা হয়।
জার্মানির উত্তর সীমান্তে ফেজউইগ প্রদেশটি ডেনমার্ককে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯২০ সালে গণভোটে
মাধ্যমে উত্তর গ্রেডউইগের শতকরা ৭৫% মানুষ ডেনমার্কে এবং দক্ষিণে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ জার্মানির সলো সংযুক্তি ভাষা। পূর্বদিকে জার্মানি প্রথম মিশেরি ও সহযোগী শক্তিগুলির হাতে মেমেল বন্দর ছেড়ে দেয়। এই বন্দরটি লাভ করে লিথুয়ানিয়া।
পোল্যান্ডের ভাগ্য নির্ধারণের প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। জার্মানি পোলান্ডকে ছেড়ে দেয় পোসেন (Posen) নামক প্রদেশটি, পশ্চিম প্রাশিয়ার অধিকাংশ এবং সমুদ্র উপকূলে যোগস্থাপনকারী প্রায় চল্লিশ মাইল দীর্ঘ পথ। এই পথ (Polish Corridor) পূর্ব প্রাশিয়াকে জার্মানি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে। চৌদ দফা শর্ত অনুসারে ডানজিগ বন্দরকে একটি মুক্ত নগরী বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়। ডানজিগ পোলান্ডোর শুষ্ক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ডানজিগের বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার দায়িত্ব ও দেওয়া হয় পোল্যান্ডকে।
উত্তর সাইলেসিয়ার দুই লক্ষ বাসিন্দার ভাগ্য নির্ধারিত হয় গণভোটের মাধ্যমে। পশ্চিম প্রাশিয়ার ম্যানিয়াওয়ার্ডার (Marienwender) এবং পূর্ব প্রাশিয়ান ( Allenstein) জেলায় ১৯২০ সালের গণভোটে জার্মানরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কয়েকটি গ্রামে পোলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সেগুলি গোলাভকে হস্তান্তরিত করা হয়। কালা এবং লৌহ আকরে সমৃদ্ধ উত্তর সাইলেশিয়ায় গণভোটের মাধ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া । শতকরা ৬০% ভোট পড়ে জার্মানির পক্ষে এবং ৪০% পোলান্ডের পক্ষে। শেষপর্যন্ত জাতিসংঘ পরিষদ, মোট জনসংখ্যা ও জমির অর্ধেকের বেশি জার্মানিকে দিলেও, আর্থিক
দিক থেকে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলি পোলান্ডের হাতে তুলে দেয়। (খ) ভাসাই সন্দির ঔপনিবেশিক শর্ত অনুসারে পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার উপনিবেশগুলির অধিকার লুপ্ত হয়য়। পূর্ব এশিয়ার জার্মান উপনিবেশগুলি লাভ করে জাপান। জার্মানিরা অন্যান্য উপনিবেশগুলিতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের (ম্যান্ডেট) অভিভাবর প্রতিষ্ঠিত হয়। নিশক্তি অধিকৃত অঞ্চে কোম্পানির সব সম্পত্তি ও অধিকার বাজেয়াপ্ত করা হয়।
১.২.২. ভার্সাই চুক্তি ও জার্মানি ভার্সাই সন্ধির শর্তগুলির সুদূর তার সমকালীন ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বাস্তবে, ভার্সাই সন্ধি সম্পাদিত হবার আগে যে প্রবল আশার সমান হয়েছিল, আর চুক্তি সম্পাদনের পাশা এত প্রবল ভিন্নতার সৃষ্টি করেছিল পারিস শান্তি সম্মেলনের প্রকৃত কৃতিত্ব বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছে। এক সমসাময়িক কূটনৈতিকের ভাষায়, “আমরা যদি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্যে যুদ্ধ করে থাকি, ত নিঃসন্দেহে শান্তির অবসান ঘটানোর জন্য শান্তি স্থাপন করেছি।" (".......if we made war to end war, we have certainly made peace to end peace.") (Croizer. A. J., The causes of The Second World War) প্যারিসের শান্তিচুক্তি এক প্রজন্মের মধ্যে মাস হয়ে যায়। একনায়কতন্ত্র, গণহত্যা এবং ব্যাপক মানণা বিপর্যস্ত করে তোলে আন্তর্জাতিক জীবন। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে লা লিখছেন, “গোটা ইয়োরোপ বৈপ্লবিক মানসিকতায় পরিপূর্ণ। ইয়োরোপের এক প্রান্ত থেকে অপর
14/339
মানুষ বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে। ("The whole of Europe is filled with the spirit of Revolution. The w order in its political, social and economic aspects is questioned by the .... population from one end or Europe to the other.") ভার্সাই চুরি তাৎপর্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে দুটি পরস্পরবিরোধী মত প্রচলিত। অধিকাংশ ঐতিহাসিকই মনে করতেন, ভার্সাই সম্মেলনে ন্যায়নীতি ও সততা বিসর্জন দিয়ে জার্মানির প্রতি অবিচার করা হয়েছে। ১৯২০-এ দশকে অধ্যাপক ডাবলিউ আইচ, জসনের মতো ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করতেন জার্মান জনগোষ্ঠীর স্বার্থে জার্মান স্বার্থের হানি করা হয়েছে। বিজয়ী মিত্রশক্তি জার্মানির প্রতি এক কঠোর না হলে, সম্ভবত জার্মানি চুক্তির শর্তগুলি স্বেচ্ছায় মেনে নিত।
14
জার্মান প্রচার মাধ্যমে এই সম্পিটিকে জবরদস্তিমূলক শান্তিচুক্তি (dictated peace diktar) বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। জার্মান সেনাধ্যক্ষ এবং রক্ষণশীল রাজনীতিবিদদের মতে, কমিউনিস্ট সম তাদের সালা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদের পিছন থেকে ছুরি মারা হয়েছে (stab in the back)। সেনানায়করা মনে করতেন জার্মানি যুদ্ধে পরাজিত হয়নি। পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে মীমাংসায় না এসে বিজ্ঞার্থী শক্তিবর্গ বিজিত দেশগুলির ওপর এই সম্পিটি
চাপিয়ে দিয়েছিল। বাস্তবে, প্রায় প্রতিটি সম্প্রিতিই নির্দেশমূলক চুক্তি, কারণ একটি বিজিত দেশ স্বেচ্ছায় তার পরাজয়ের ফলাফল বড় একটা মেনে নেয়া না। কিন্তু আধুনিক কালে সম্পাদিত অন্যান্য চুক্তির তুলনায়, ভার্সাই সন্ধিতে বিজিত শত্রুর প্রতি বিজেতার হুকুমদারির মনোভাব বেশিমাত্রায় দেখা যায়। অধ্যাপক ই. এইচ. কারের মতে, ভাসাইতে জার্মানি প্রতিনিধিদের হাতে যে খসড়া চুষ্টি দেওয়া হয়েছিল, তার ওপর তাদের লিখিত মতামত পেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়। জার্মান প্রতিনিধিদের মতামতগুলির কিছু বিবেচনা করে সংশোধিত ভাষাটি তাদের হাতে তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হুমকি দেওয়া হয়, পাঁচদিনের মধ্যে চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে পুনরায় যুদ্ধ আরম্ভ হবে। মন্দির খসড়া পেশ ও দগিতে স্বাক্ষাদান এই দুটি অনুষ্ঠান ছাড়া আর কোনো সময় জার্মান প্রতিনিধিরা মিত্রপক্ষীয় প্রতিনিধিরা মিত্রপক্ষীয় প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হন নি। এমন কি এই দুটি অনুষ্ঠানেও সামাজিক রীতিনীতি অনুসারে সাধারণ ভদ্রতা ও সৌজন্য দেখানো হয়নি। স্বাক্ষরদান অনুষ্ঠানে দুই জার্মান স্বাক্ষরকারীদের মিত্রপক্ষীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক টেবিলে বসতে দেওয়া হয়নি। আসামীদের যেভাবে আদালতের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেভাবে তাদের রক্ষীপরিকৃত অবস্থায় আলোচনা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যুদ্ধকালীন চিকতা থেকে উদ্ভূত এইসব অপ্রয়োজনীয় অপমান জার্মানি এবং এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল জার্মানি ও অন্যান্য দেশের জনমতের এক বিরাট অংশ প্রকারান্তরে বিশ্বাস করেছিল, জার্মানির কাছ থেকে জোর করে আদায় করা অনুমোদন, নৈতিকভাবে জার্মানির পক্ষে বাধ্যতামূলক নয়।
ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সমালোচনা— এই সন্ধির শর্তাবলী জার্মানির পক্ষে কঠোর ও নির্মন, জার্মানিকে রাজনৈতিক ও সামরিক বিভিন্ন দিক থেকে দুর্বল করে রাখার চেষ্টা করা হয়। রাইন অঞ্চলকে বেসামরিকীকরণ করা হয়। এছাড়া, জার্মানিকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে এক বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপুরণের বোঝা তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওার হয়। সামরিক শর্তগুলিতে বিজয়ী বিজিত। উভয় পক্ষের
পারস্পরিক দায়িত্ব স্বীকৃত না হওয়ায় জার্মানি এককভাবে এই শর্তগুলি পালনে কর্ম হয়। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক দিক থেকে শিল্পপ্রধান মার অল জার্মানির হাতছাড়া হয়ে যায়। জার্মানি শতকরা
১৫% কৃষিক্ষেত্র শতকরা ১২ শিল্পক্ষের থেকে বর্ণিত হয়। ভাসাই চুক্তির অর্থনৈতিক ফলাফল আলোচনা প্রসলো বিখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ কে. এম. কেইনস্-এর বক্তব্যের উল্লেখ করা যায়। ১৯১৯-এর শেষে কেইস রচিত The Economics Consequences of the Peace দুটি প্রকাশিত হয়। এই বইটি ইয়োরোপে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল। কেইন্স ভার্সাই সম্মেলনে ব্রিটেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি ভার্সাই চুক্তির অর্থনৈতিক শর্তের তাঁর সমালোচনা করেন।
কেইনসের মতে, মহাযুদ্ধের আগে ইয়োরোপীয় অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব শিল্পগত বিকাশ হয়েছিল। অচুনা মূলধন অর্জন করে ইয়োরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলি নিজেদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য জী মান নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে মূলধন রপ্তানি করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশে সাহায্য করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের ফলে ছবিটি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। মহাদেশের বড় অংশে অর্থনীতি মৃত প্রায় হয়ে
कोई टिप्पणी नहीं:
एक टिप्पणी भेजें